Mohammad Bin Siraj

চলচিত্র সিনেমা হলো এমন একটি মাধ্যম যা দিয়ে সমাজের প্রতিচ্ছবি মানুষের কাছে পৌছিয়ে দেওয়া যায়।বলা হয় এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।মাঝেমধ্যে এই সিনেমা অনেক বিতর্কেরও সৃষ্টি করে। নগ্নতা বা যৌনতার, রাজনৈতিক, মানবিক মূল্যবোধের ও ধর্মানুভূতির উপর আঘাত হানার কারণে এইসব সিনেমা বিতর্কিত হয়ে থাকে। আবার কখনো কখনো নেতিবাচক দৃশ্যের কারণে আলোচিত সিনেমাগুলো নিষিদ্ধ হয়ে যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।আবার এমন কিছু কিছু চলচ্চিত্র আছে যেগুলো মানুষের মানসিকের উপর আঘাত হানে।অনেক তো জেনেছেন পড়েছেন শুনেছেন, সিনেমার গুণাগুণ আর প্রশংসা নিয়ে, আজ চলুন ডুব দেই, সিনেমার এক অন্ধকার জগতে।যেখানে আমরা বিশ্বের বহুআলোচিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করব
১. আ ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ

অ্যা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে।এইটি পরিচালনা করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা কুব্রিকের বিখ্যাত সিনেমা ।এছাড়াও মালকম ম্যাকডাওয়েল, প্যাট্রিক ম্যাগি, মাইকেল বিটস অভিনয় করেন এই বিতর্কিত ছবিটিতে। অ্যান্থনি বার্গাসের উপন্যাস অবলম্বনে বানানো হয়।সিনেমাতে যৌনতা আর নগ্নতার দৃশ্যগুলোর ছাড়াও প্রচুর পরিমাণের অপরাধ বিষয়ক হত্যা, ধর্ষণ আর শারীরিক নির্যাতনের দৃশ্য থাকায় আমেরিকা সহ বেশ কিছু দেশে এত সহজে ছবিটির মুক্তি মেলেনি। কুব্রিক নিজেই ব্রিটেন থেকে সিনেমাটি প্রত্যাহার করে নেন। স্কালা সিনেমা ক্লাব একবার সিনেমাটির প্রদর্শনী করে মোটা অঙ্কের জরিমানাও দেয়। পরে ১৯৯৯ সালে কুব্রিকের মৃত্যুর পর, দীর্ঘ ২৭ বছর পর আবার যুক্তরাজ্যে সিনেমাটি প্রদর্শনের অনুমতি পাওয়া যায়।


২ .জোকার

২০২০ সালে মুক্তির পাই বিশ্বের বিখ্যাত সুপার ভিলেন মুভি জোকার।কিন্তু এই সিনেমা ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অস্থিরতার বেড়ে দিয়েছে।যেদিন সিনেমা মুক্তি পায়, সেই দিনই দেশের বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলির ঘটনা বৃদ্ধির ঘটে।সাত বছর আগে দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস এর এক শুটিংয়ের সময় কলোরাডোর অরোরায় এক গোলাগুলির ঘটনায় ৭০জন মানুষ আহত এবং ১৩জন নিহত হয়েছিল।এই আহত-নিহত পরিবারগুলোর অনেকের অভিযোগ, সিনেমাটি জোকারের অ্যযুক্তিকের কর্মকাণ্ডগুলো উপস্থাপন করার ফলে অনেকেই সামাজিক অপরাধ করতে আরও বেশি উৎসাহিত হতে পারে।আগে সুপারহিরো সিনেমা মুক্তির সময় মুখোশ পড়ে বা পেইন্ট দিয়ে মুখ রাঙ্গিয়ে সিনেমা দেখতে আসার রেওয়াজ ছিল সারা দুনিয়াতেই।কিন্তু আমেরিকার কয়েকটি শহরের সিনেমা হল ঘোষণা করেছে, মুখোশ পড়ে বা পেইন্ট দিয়ে মুখ রাঙ্গিয়ে কেউ হলে ঢুকতে পারবেন না।জোকার সিনেমা মূলত আর্থার ফ্লেক নামী একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির গল্প, যার পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতা তাকে এক সময় সহিংস করে তোলে।মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা বলছেন এমনিতেই সমাজে মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।এখন এই সিনেমার কারণে অনেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করতে পারেন।
৩. দ্য বার্থ অফ এ নেশন
দ্য বার্থ অফ এ নেশন ছবিটি মুক্তি পায় ১৯১৫ সালে। এতে অভিনয় করেছেন লিলিয়ান জিয়াস, মে মার্শ, হেনরি বি ওয়াল্টহল সহ আরও অনেকে।তবে সিনেমাটিতে বর্ণবাদের মত সংবেদনশীল প্রসঙ্গ রয়েছে।এই ছবিটি নিয়ে আমেরিকা সহ বেশ কিছু দেশে বিতর্কিত রয়েছে।বলা হয়
কে কে কে এই সংগঠন পুনরায় ঘটিত হয়, “দ্যা বার্থ অফ এ ন্যাশন মুভিটার দ্বারা, এবং ইতিহাসে একটি বর্ণবাদ প্রোমোট করে এমন একটা নৃশংস মুভি ছিলো এটা।কু ক্লাক্স ক্ল্যান বা কেকেকে হচ্ছে আমেরিকার প্রথম সন্ত্রাসী সংগঠন।এই সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের দমিয়ে রেখে শ্বেতাঙ্গ মানুষগুলোর আধিপত্য বজায় রাখা।বিশেষ করে ছবিটিতে এক আফ্রিকান নিগ্রো চরিত্রকে অতিরিক্ত যৌন আসক্ত চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়, তা অনেক বেশি বিতর্কের সৃষ্টি করে। কারণ সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেটি কিছুটা বর্বরতা ও অসঙ্গতি। আর সে কারণেই সিনেমাটি মুক্তির পর বিতর্কের ঝড় ওঠে।ফলে আমেরিকার শিকাগো সহ বেশ কিছু রাজ্যগুলোতে সিনেমাটি মুক্তির পায়নি।
৪. দ্য ইন্টারভিউ

দ্য ইন্টারভিউ ২০১৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি রাজনৈতিক কমেডি নির্ভর আমেরিকান চলচ্চিত্র।এইটি যৌথ পরিচালনা করেন সেথ রজেন এবং ইভাব গোল্ডবার্গের।চলচিত্রের কাহিনীতে দেখা যাবে সিআইএ’র ভাড়াটে দু’জন সাংবাদিক অভিনেতা রজেন এবং জেমস ফ্রাংকো যারা উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন এর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে হত্যা করার নির্দেশনা পায়। ২০১৪ সালের জুন মাসে উত্তর কোরিয়া হুমকি দেয় যদি চলচ্চিত্রটির পরিবেশক কলাম্বিয়া পিকচার্স মুভি থেকে মুক্তি দেয় তবে আমেরিকার বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউজ উড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে উত্তর কোরিয়া।পরে সিনেমাটি যে হলে প্রদর্শন করা হবে সেখানে হামলার হুমকি দিয়েছিল ‘গার্ডিয়ান অব পিস’ নামের একটি সংগঠন।এতসব ঘটনার পরেও সিনেমাটি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেমা হলে সীমিত পরিসরে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল কিন্তু বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার নিষিদ্ধ আছে ছবিটি।
৫. ফায়ার

ফায়ার চলচ্চিত্রটি সমকামিতানির্ভর প্রথম হিন্দি চলচ্চিত্র হিসেবে ধরা হয়। নগ্নতা ও তৎকালিন ভারতের সামাজিক ব্যবস্থা উপর প্রশ্ন উঠায় প্রচুর পরিমাণে বিতর্কিত পড়তে হয়েছিল সিনেমাটি।কারণ সেইসময় ভারতবর্ষে সমকামিতা বিষয়টা সহজভাবে নেওয়া হতো না। সিনেমাটি দুইটি নারীর সমকামিতার সম্পর্ক নিয়ে তুলে ধরা হয়।তবে তার এই সিনেমা নিয়ে তীব্র বিতর্ক বাঁধায় শিবসেনা সংগঠন।সিনেমাটি মুক্তির দিনেই হিন্দু চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো সিনেমাহলে ভাংচুর চালায়। এরপর সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধ করে পরে সিনেমাটি ব্যান করে দেওয়া হয়।কিন্তু ঠিক দুই বছর পর ১৯৯৮ সালে ভারতজুড়ে মুক্তি পায় সিনেমাটি।
৬. দ্য এক্সরসিস্ট
১৯৭৩ সালের ১৯ জুন মুক্তি পায় সিনেমাজগতের অন্যতম সেরা হরর সিনেমা দ্য এক্সরসিস্ট। সিনেমাটি পরিচালনা করেন উইলিয়াম ফেড্রিক।
এতে অভিনয় করেন এলেন বার্সতিন, ম্যাক্স ভন সিড্যো, লী জে কব, লিন্ডা ব্লেয়ার সহ অনেকে। ব্রিটিশ এক পাদ্রির শয়তানের উপাসনা করার খবর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল সেসময়। তারই ঘটনার অনুকরণে উইলিয়াম পিটার ব্ল্যাটি একটি উপন্যাস লেখেন। পরে সেখান থেকেই সিনেমাটি বানানো হয়। আর বানানোর সময় একের পর এক দুর্ঘটনায় এমন গুজবও ছড়িয়ে পরে যে, সিনেমাটাই অভিশপ্ত।সিনেমা কাস্টিং এর সময় বহু দুর্ঘটনা ও বিপত্তির মুখে পরতে হয় পরিচালনা ও কলাকুশলীদের।সিনেমাটি এক সময় হরর সিনেমার সবচেয়ে আয় করা সিনেমাগুলোর কাতারে ঢুকে পরে। তবে প্রযোজনা সংস্থা ওয়ার্নার ব্রাদার্সের নিষেধাজ্ঞার ভয়ে সিনেমাটির ভিডিও কপি ব্রিটেনের বাজারে ছাড়া হয় ১৯৮৪ সালে। পরে ১৯৮৬ সালে সিনেমাটি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ১৯৯৯ সালে সিনেমাটি আনকাট ছাড়পত্র পায়।বর্তমানে এটি বিশ্বের জনপ্রিয় একটি সিনেমা।
৭. ক্যানিবল হলোকাস্ট

ক্যানিবল হলোকাস্ট সিনেমাটি মুক্তি পায় ৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৮০ সালে।কিন্তু এটিকে সর্বকালের অন্যতম বিতর্কিত সিনেমা বলা হয়ে থাকে।এই ছবিটি রচনা ও পরিচালনা করেন রজারো দেওদাতো।অভিনয় করেন রবার্ট কারম্যান, ফ্রান্সেস্কা চারডি, পেরি পেরকানেন সহ অনেকেই।
এর কাহিনি মূলত আমাজনের ক্যানিবল তথা নরখাদক গোত্রদের নিয়ে।সিনেমায় আমাজনের নরখাদক গোষ্ঠীের উপর ডকুমেন্টারি বানাতে গিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় চার জনের একটি দল। তাদের উদ্ধারে অভিযানে নামে আরেকটি দল। কিন্তু আপত্তিকর নৃশংস ও ভয়ক দৃশ্য দেখানোর জন্য সিনেমাটি আমেরিকা, ইতালি, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়াসহ প্রায় সব দেশেই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এমনকি পরিচালক রজারো দেওদাতোর বিরুদ্ধে সেই নিরুদ্দেশ চার অভিনেতাকে খুনের দায়ে মামলা করা হয়। তাকে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করতে হয়, কীভাবে এতটা বাস্তবধর্মী দৃশ্য দেখানো হল। পরে তিনি সিনেমার সকল অভিনেতাদের আদালতে হাজির করে তবেই মুক্তি পান। তবে সিনেমাটিতে প্রাণীদের অত্যাচার করার জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদন্ড পেতে হয় তাকে।
৮. দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অব খ্রাইস্ট
মার্টিন স্করসিস পরিচালিত এই সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৮৮ সালের ১২ আগস্ট। নির্মাণের দিক দিয়ে মাস্টারক্লাস হলেও সিনেমার কাহিনী ছিল স্পর্শকাতর। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুভূতিকে আঘাত দেয়ার কারণে তুরস্ক,মালয়েশিয়া , সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, মেক্সিকো, চিলি এবং আর্জেন্টিনাতে নিষিদ্ধ হয় ছবিটি। যেখানে যীশুর চরিত্র মানবীয় দোষ-ত্রুটি লোভ-লালসা ভয়-ক্রোধ-ভালোবাসা দেখানো হয়েছে সিনেমাটিতে। বিশেষ করে মেরি ম্যাগডালিনের সঙ্গে যীশুর ভালোবাসা তো বটেই, শারীরিক সম্পর্কও দেখানোটা রক্ষণশীল খ্রিষ্টানরা মোটেই ভালো ভাবে গ্রহণ করেনি। আর তা একেবারেই সহ্য করতে পারেনি বেশ কিছু দেশের সেন্সর বোর্ড।
৯. অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট
১৯৩০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পায় লুইস মাইলস্টোন পরিচালিত যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র।

যা এরিক মারিয়া রেমার্ক এর এক উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়।
হিটলার এই ছবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। জার্মানি, ও অস্ট্রিয়ায় ১২ বছর ধরে নিষিদ্ধ ছিল এই সিনেমা।কারণ ছবিটি হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ওপর তৈরি করা।এছাড়া এতে হিটলারের পাশবিক নির্যাতনের দিকও তুলে ধরা হয়।যার কারণে এই ছবি দেখলে নাত্‍সি বাহিনীর অত্যাচারের মুখে পড়তে হত দর্শকদের।চলচ্চিত্রটি
সেরা ছবি এবং সেরা পরিচালকের জন্য একাডেমি পুরস্কার অর্জন করে

মেথড অ্যাক্টিং চলচ্চিত্রে কলাকুশলীদের উপর প্রভাব:
আমরা চলচ্চিত্রে অনেক নায়ক বা খলনায়কের অনেক চরিত্রের অভিনয় দেখতে পাই।বিশেষ চরে খলনায়কদের চরিত্রই দর্শকদের পছন্দ প্রথম তালিকায় পড়ে।কারণ নেতিবাচক চরিত্রগুলাই চলচ্চিত্রকে প্রাণবন্ত বা জমিয়ে তুলতে সক্ষম হয়।কিন্তু আমরা হয়তো জানি না এইসব চরিত্র অভিনেতাদের উপর কিরূপ মানসিক প্রভাব পড়ে।চরিত্রে অভিনয় করার জন্য শিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ বা চর্চা করেন।দর্শককে কিছু বুঝতে না দিয়ে একটি দৃশ্যকে বাস্তবসম্মত করে তুলতে সত্যি সত্যি মদ খেয়ে মাতাল হওয়া, কখনো খেয়েদেয়ে ওজন বাড়িয়ে ফেলা, আবার কখনো কঠিন ডায়েট করে একদম জিরো ফিগার বানিয়ে ফেলা এইসব পদ্ধতিকে মেথড অ্যাক্টিং বলে।নিজেদের অভিনয়কে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে মেথড অভিনেতারাও মাঝে মাঝে অনেক পাগলামি করে বসেন। তেমন কিছু পাগলামির উদাহরণ আজকে দেখে নেয়া যাক।
সুইসাইড স্কোয়াড ছবিটিতে জোকার চরিত্রে অভিনয় করা জারেড লেটো জোকার চরিত্রটির সাথে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলেন যে তার সহ অভিনেতাদের হয়রানি করতে বুলেটের প্যাকেজ, মৃত শূকর, জীবন্ত ইঁদুর, এমনকি ব্যবহৃত কনডম পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন।যা বিকৃত মানসিকতার পরিচয় বহন করে।আবার মার্লন ব্রান্ডোলাস্ট এর অভিনীত ট্যাংগো ইন প্যারিস নায়িকার সাথে একটি ধর্ষণের দৃশ্যের জন্য সত্যি সত্যি তিনি তাকে ধর্ষণ করে বসেন।এই বিষয়টি ব্রান্ডো আর ডিরেক্টর ছাড়া আর কেউ জানত না।কিন্তু সেই চলচ্চিত্রটি নিয়ে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে মুখ খোলেন নায়িকা মারিয়া শিন্ডার। মেথড অ্যাক্টিং-এর নামে এমন বিকৃত রুচির পরিচয় রীতিমতো ঘৃণার উদ্রেক করে।
এছাড়া ভারতীয় বাংলা চ্যানেল স্টার জলসা গত কয়েকমাস যাবত প্রচারিত হয়ে আসছে একটি টিভি সিরিয়াল ‘পটলকুমার গানওয়ালা’। এতে একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করছে ছয় বছরের অভিনেত্রী সিঞ্চনা সরকার। এই জনপ্রিয় ধারাবাহিকের খলনায়িকা রূপে প্রতিদিন দর্শকের সামনে হাজির হচ্ছে এই শিশুটি।কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই বয়সের শিশু অভিনেতাকে দিয়ে একটি নেতিবাচক চরিত্র করানো কতটা যুক্তিসঙ্গত!শিশুদের কোমল মনে হিংসা ও স্বার্থপরতা প্রবেশ করানো হচ্ছে।যার প্রভাব বাস্তব জীবনেও পরা শুরু হতে পারে।
রণবীর সিং ‘লুটেরা’ সিনেমার একটি দৃশ্যে নায়িকা সোনাক্ষী সিনহার সাথে চিৎকার করতে পুরো দৃশ্য জুড়ে নিজেকে পিনের খোঁচায় জর্জরিত করেন যাতে গলা থেকে ঠিকমতো চিৎকার বের হয়।আবার ৯০ শতকে আমেরিকায় আত্মহত্যার এক শুটিং করতে গিয়ে সত্যিই সত্যিই আত্মহত্যা করে বসেন এক অভিনেত্রী।
অভিনয়ে যেইরকম পদ্ধতি অনুসরণ করুক না কেন একজন অভিনেতা তার বাস্তব জীবন আর অভিনয় জীবনের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছেন কিনা এটা একেবারেই তার ব্যক্তিগত দক্ষতার ব্যাপার। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় বিষয়। কিন্তু সেই চরিত্রের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলা সত্যিই বোকামি। এছাড়াও অভিনয় চরিত্র থেকে নিজেদের বের করে আনতে বিভিন্ন মানসিক ও শারীরিক সমস্যায় ভুগতে হয় অ্যাক্টরদের।বিভিন্ন সময় অ্যাক্টরদের অভিনয় দর্শকদের উপর ভয়ংকর রকম প্রভাব ফেলে।যেমন গত ১৪ ই জুন অতিরিক্ত হতাশায় আত্মহত্যা করে বসে সুশান্ত সিং রাজপুত।১৬ই জুন বিকেলে মুম্বাইয়ে যখন সুশান্তের শেষকৃত্যানুষ্ঠান হচ্ছিলো, ঠিক তখনই খবর আসে, সুশান্তের মৃত্যু শোক সইতে না পেরে মারা গেছেন বিহারে তার চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী সুধাদেবী ।তার পরেরদিনই আত্মহত্যা করে বসে বিহারের দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্র এবং সুশান্তের মৃত্যুতে ডিপ্রেশনে চলে যাওয়া ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী।

চলুন জেনে নিই এইসব সিনেমার সম্পর্কে আইন কি বলে?
ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র আইন পাশ হয় ১৮৭৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি।তৎকালীন বিট্রিশ সরকার কতিপয় নাটক মঞ্চায়ন নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশে বলা হয় যে, যখন গভর্নর মনে করবেন যে মঞ্চস্থ হয়েছে বা হতে যাচ্ছে এমন কোনো নাট্যকর্ম কুৎসাপূর্ণ বা নাশকতামূলক প্রকৃতির বা তা থেকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে বা সে ধরনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গের জন্য ক্ষতিকর, নৈতিকভাবে হানিকর হতে পারে বা অন্য কোনোভাবে জনস্বার্থের পক্ষে হানিকর হয়, তাহলে সরকার আদেশবলে সে ধরনের অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করতে পারেন। অধ্যাদেশে আরও বলা হয় যে, ওই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে শুধু যে প্রযোজক, পরিচালক এবং অভিনেতা অভিনেত্রীরাই আইনত শাস্তিযোগ্য হবেন তা নয়, দর্শক এবং থিয়েটার বা মঞ্চের মালিকরাও আইনত শাস্তির যোগ্য হবেন।অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রতিবাদ করেন। জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনসমূহ আইনটিকে একটি ঘৃণ্য কালো আইন হিসেবে বিবেচনা করতেন। তারা এ আইনের বিরুদ্ধে কার্যকর জনমত গড়ে তোলার প্রয়াস নেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা জনসমর্থন লাভে ব্যর্থ হনভারত বিভক্তির পর ১৯৫৪ সালে মাদ্রাজ হাইকোর্ট, ১৯৫৬ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট এবং ১৯৫৮ সালে পাঞ্জাব হাইকোর্ট এ আইনকে অকার্যকর ঘোষণা করে। ১৯৬২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওয়েস্ট বেঙ্গল ড্রামাটিক পারফরম্যান্স বিল নামে আইনের একটি নতুন খসড়া তৈরি করে। কিন্তু গণপ্রতিবাদের মুখে সরকার ১৯৬৩ সালে বিলটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে ২০০১ সালের ৩০ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন ১৮৭৬ রহিত করা হয়।


    লেখক সম্পর্কে

    devadministrator