সাইবর্গঃ যান্ত্রিক মানুষ- পরিচিত তবে অজানা এক বিষয়ের আলোচনা।

আমরা মুভি সিনেমাতে প্রায় সময় দেখি মানব রোবটের চরিত্র। বহু ব্লক বাস্টার মুভির চরিত্র গুলোতেও আছে এর ছাপ, যার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ আইরন ম্যান। আইরন ম্যানের শরীরে দেখা যায় মেশিনের স্থাপনা, যা তার চরিত্রকে করেছে উজ্জীবিত। কিন্তু এখানে সূক্ষ্ম একটি প্রশ্ন থেকে যায়, তা হলো আইরন ম্যানের চরিত্র কী আদৌ মানব রোবটের প্রতিফলন নাকি অন্য কিছু?

মানব রোবট হলো, মানুষের মতো তৈরি দেহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আস্ফালন। তবে আইরন ম্যান তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ছিলেন না। তাহলে এই ধরণের প্রতিস্থাপনকে কী বলা হয়?

হ্যাঁ, সকল প্রশ্নের একটিই উত্তর। তা হলো সাইবর্গ!

সাইবর্গের ইতিকথা

সাইবর্গ হলো কোন জীবের দেহের মধ্যে প্রতিস্থাপিত এক ধরণের টেকনোলজি যা জীবের শরীরের জৈবিক কার্যক্রমের সাথে খাপ খেতে পারে, অন্যভাবে বলতে গেলে শরীরের একটি কৃত্রিম অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে করে সাইবারনেটিক জীব মানসিক এবং শারীরিকভাবে সাধারণ জীবের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধে থাকে, তা বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক অথবা রোবটিক উপাদান শরীরের মধ্যে তৈরির মাধমেও হতে পারে।

মানুষ যন্ত্রের মিশ্রণের ধারণা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে সায়েন্স ফিকশনের বইগুলোতে বেশ প্রশারিত ছিলো। ১৯৬০ সালে আমেরিকার মহাকাশ অভিযানের বিভিন্ন প্রতিকূলতা এবং প্রতিবন্ধকতা এড়াতে এক জোড়া বিজ্ঞানী ম্যানফ্রেড এডওয়ার্ড ক্লাইন্স ও নাথান এস. ক্লাইন- ফার্মাকোলজিকাল ইন্টারভেনশন (ঔষধসংক্রান্ত যেই নিয়মে ঔষধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেহে প্রবেশ করে), যোগব্যায়াম, হাইপোনটিজম (সম্মোহিত অবস্থা), পারমাণবিক চালিত শ্বাস প্রশ্বাস (ফুসফুস প্রতিস্থাপনের প্রেক্ষিতে) উপর গবেষনা চালাতে গিয়ে তারা সাইবর্গ শব্দ এবং এর ধারণা প্রথমবারের মতো পৃথিবীতে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভাবন করেন।
সেই থেকে আজ ৬০ বছর হয়ে গেলো। সাইবর্গের সেই যথার্থ দুর্বোধ্য সংজ্ঞায় আসলো বিপুল পরিবর্তন। এবং নানা বিবর্তনে এর সংজ্ঞা হয়ে গেলো সহজ থেকে সহজতর। এবং বেরিয়ে আসলো, “যান্ত্রিকভাবে/রোবটিক্যালি উন্নত জীব” / “শরীরে প্রযুক্তি সংলগ্ন মানব”।

চলমান সময়কালে, অনেক জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে সাইবর্গের উপর ভিত্তি করে চলে এসেছে আধা মানুষ আধা যন্ত্রের চরিত্র, সাইবারম্যান, দ্যা সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান, ডালেক্স, বায়োনিক ওম্যান, টারমিন্যাটর, রোবকোপ ইত্যাদি। নানা সমলোচিত সূত্র এবং একাডেমিয়ার মধ্যে, “সাইবর্গ ম্যানিফেস্টো” – এর লেখক ডোনা হারাওয়ে এই নারীবাদী সমালোচনামূলক প্রবন্ধে সাইবর্গের বর্ণসঙ্করের উপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং যুক্তি স্থাপন করে যে আমরা সকলে সাইবর্গ সত্তা। এবং এই ভাবনাটি অনেক চিন্তাবিদদের দ্বারা প্রাসঙ্গিকতার আঙিনায় দাঁড় করানো হয় এই মর্মে যে, আমরা কোন না কোন ভাবে প্রযুক্তিগত সহায়তার উপর নির্ভরশীল।

অনেক তো হলো, স্ক্রীন এবং বইয়ে থাকা সাইবর্গ চরিত্রের উপর কথা বার্তা, চললো বেশ কল্পনা-জল্পনা, এবার বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া যাক। চলুন জেনে নেই, এমন সব মানব সম্বন্ধে যারা সাইবর্গ শাখায় বেশ আলোড়ন ঘটিয়েছিলো এবং বিশ্বের দরবারে নিজেদের সাইবর্গ হিসেবে পরিচয় দিয়ে আছেন।

নীল হারবিসন

বর্ণান্ধতা নিয়ে জন্মানো এই ব্যাক্তি দেখতে অনেকটা পিঁপড়ার ন্যায়। কারণ তার মাথার উপর এমন একটি এন্টেনা রয়েছে যা রঙকে ধ্বনিতে এবং তা থেকে বাদ্যযন্ত্রের মাপকাঠিতে মেপে তা নির্ধারিত করে থাকে। সোজাভাবে, মিউজিকাল সাউন্ডের মাধ্যমে সে রঙ বুঝতে পারে। সে সাধারণ মানুষের রঙের উপলব্ধির চাইতে বেশী উপভোগ করতে পারে। ১০ বছরের চাইতে বেশী সময় ধরে সে সাইবর্গ হিসেবে বেঁচে আছে। এবং সে তার মাথার উপরের যন্ত্রটির নাম দিয়েছে “আইবর্গ (eyeborg)”! হারবিসন বিশ্বাস করে, এটা মানুষের কর্তব্য যেন তারা টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের প্রগিতিশীল করে এবং নিকটতম ভবিষ্যতে মানুষ মাথার পেছনে চোখ ব্যবহার করার মাধ্যমে আধুনিক এই বিশ্বের আধুকিকতা আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।

ব্রিটিশ-আইরিশ বংশদ্ভুত ব্যক্তিটি শব্দ শুনতে পান

ডাঃ কেভিন ওয়ারউই

রিডিং ইউনিভার্সিটির সাইবারন্যাটিক ডিপার্টমেন্টের এক প্রফেসর, ১৯৯৮ সাল থেকে নিজের শরীরের উপর বিভিন্ন পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন যন্ত্র প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। যেমন, বাহুতে মাইক্রোচিপ বসানোর মাধ্যমে লাইট, হিটার অথবা কম্পিউটার দূর থেকে পরিচালনা করতে পারে বাহুর সাহায্যে। সবচাইতে মজার বিষয় হচ্ছে, এই প্রফেসরটি তার স্ত্রীর উপরও এমন প্রতিস্থাপন দিয়েছে যার মাধ্যমে তার স্ত্রীর হাত কেউ ধরলে, প্রফেসর সংবেদন পেতো। বেশ রোমাঞ্চকর ও ভয়ংকরও বটে। আর তিনি হলেন, ক্যাপ্টেন সাইবর্গ তথা ডাঃ কেভিন ওয়ারউইক! তিনি প্রজেক্ট সাইবর্গের প্রতিষ্ঠাতা, তার উদ্দেশ্য নিজেকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বের প্রথম পরিপূর্ণ সাইবর্গ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণায় নিয়োজিত এই ব্যক্তি ২০১৪ সালে গুরুতর সমালোচনার মুখোমুখি হন সুপার কম্পিউটার ইউজিন গোস্টম্যানের (Eugene Goostman) উপর মন্তব্য আরোপ করায়।

ডাঃ কেভিন ওয়ারউই এর কার্যক্রম বেশ চমকপ্রদ

জেসি সুলিভান

ইলেক্ট্রিকাল লাইন্সম্যান সুলিভান। ২০০১ সালে কাজ করার সময়, সে এতো ভীষণভাবে তড়িৎঘাতের সম্মুখীন হয়, যার ফলে তার জীবন দুর্বিষহ এবং হুমকির মুখে পতিত হওয়ায় তার দু হাত কেটে ফেলতে হয়। কর্তিত হাত সমূহের স্থানে রোবটিক প্রস্থেটিক (কৃত্রিম) স্থাপন করে দেওয়ার জন্য শিকাগোর পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান প্রস্তাবনা দিলে, সে সাদরে তা গ্রহণ করে। এবং এর সুবাদে সে বায়োনিক হাত প্রাপ্তির মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম “বায়োনিক ম্যান” হিসেবে আখ্যায়িত হয়। কৃত্রিম হাত দুটো তার স্নায়ুর সাথে এমনভাবে সংযুক্ত হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সে তা তার মস্তিষ্কের সংবেদনের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে পেশির সাহায্যে হাত দুটো ব্যবহার করতে পারে। মোটকথা স্বাভাবিক হাত যেমনটা সে অনুভব করতো, ঠিক তেমনি ভাবে এই কৃত্রিম হাত দুটির তাপমাত্রা, কতটুকু শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মুষ্টি তৈরি করছে, আঘাত, স্পর্শ সকল কিছু অনুভব করতে পারে।

Jesse Sullivan and Claudia Mitchell Holding hands!

জেনস নওমান

দুটি আতঙ্ককর দুর্ঘটনার ফলে পুরোপুরি অন্ধত্ব বরণ করে ২০০২ সাল পৃথিবীর সর্বপ্রথম কৃত্রিম দৃষ্টিশক্তি পদ্ধতির অধিকারী হয়ে উঠেন জেনস নওমান। তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়, এক জোড়া বৈদ্যুতিক চক্ষু সরাসরি তার ভিজুয়াল কর্টেক্সে মস্তিষ্কের প্রতিস্থাপনার সাহায্যে বসিয়ে। এর অবশ্য কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, সে আকার-লাইন অস্পষ্টভাবে দেখতে পায়।
আরেকটা উত্তেজনাদায়ক খবর হচ্ছে, স্যামসাং কোম্পানি ৬০০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার একটি স্মার্টফোন তৈরির উপর কাজ করছে, যা মানুষের ৫৭৬ মেগাপিক্সেলের চাইতেও বেশী। সাম্প্রতিক তাদের তৈরি S20 সিরিজেও এককভাবে রয়েছে ১০৮ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা।

গরিবের X-Men Cyclops

স্টেলিওস আর্কেডিয়ো

অভিনয় শিল্পী স্টেলার্কের প্রযুক্তির প্রতি রয়েছে আলাদা টান এবং রয়েছে মানবদেহের প্রতি অবজ্ঞা। “মানব দেহ অচল” এবং তার এই বিশ্বাস প্রমাণ করতে সে তার বাহুতে অস্ত্রোপাচার করে কৃত্রিম কান প্রতিস্থাপন করে। আবার সে বিদ্যুদ্বাহক ঢুকায় তার শরীরে যাতে করে মানুষ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তার পেশী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তিনি এক সাক্ষাত্কারে বলেন, “মানুষের ফ্রাঙ্কেনস্টেইনীয় ভীতি থাকা উচিত নয় শরীরে প্রযুক্তি অন্তর্ভূক্ত করার ক্ষেত্রে। এবং প্রযুক্তির সাথে আমাদের সম্পর্ক ফাউস্টিয়ান ভাবে বিবেচনা করা অনুচিত, যে আমরা আমাদের আত্মা প্রযুক্তির কাছে বিক্রি করে দিচ্ছি এই নিষিদ্ধ শক্তিসমূহ ব্যবহারের মাধ্যমে। আমার মনোভাব আগেও ছিলো এবং এখনো আছে, যে আমার শরীরে প্রযুক্তি হলো উপাঙ্গ!”

এই হলো তার কৃত্রিম হাত, ভয়ানক!

উপরে পাঁচজন সাইবর্গের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এমন Claudia Mitchell, Cameron Clapp, Jerry Jalava এবং আরও অনেকেই আছে যারা সাইবর্গের জন্য পরিচিত। সাইবর্গ এখন প্রসারিত হয়েছে, চিকিৎসাক্ষেত্রে, সামরিক বাহিনীতে, খেলাধুলাতে, শিল্পে, জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে, মহাকাশে এবং ধীবিজ্ঞানেও। আমাদেরকে জানান আপনার সাইবর্গ সম্পর্কে মন্তব্য এবং প্রতিক্রিয়া। সাইবারন্যাটিক অর্গানিজম কী আদৌ মানুষের জন্য আশির্বাদ নাকি সুস্পষ্ট অভিশাপ, প্রশ্ন থেকে গেলো পাঠকদের নিকট!!!



References-
1. 7 Real-Life Human Cyborgs By Bryan Nelson
2. The World’s Most Famous Real-Life Cyborgs
3. CYBORG


    লেখক সম্পর্কে

    devadministrator